নবী-রাসুল ব্যতীত অন্যদের ওপর দরুদ ও সালাম পাঠের বিধান: তাফসির ও চার মাযহাবের ফিকহের আলোকে একটি তাহক্বীক্বী পর্যালোচনা
ভূমিকা
ইসলামি পরিভাষায় ‘সালাত’ (الصَّلَاةُ) শব্দটির আভিধানিক অর্থ মূলত দোয়া, ক্ষমা প্রার্থনা ও রহমত কামনা। কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য নির্দেশনায় নবী ও রাসুলগণের (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করা উম্মতের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। তবে নবুওয়াতের ধারার বাইরে সাধারণ কোনো মুমিন, সাহাবী, তাবেয়ী কিংবা ওলি-বুজুর্গের নামের সাথে একক ও স্বতন্ত্রভাবে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ কিংবা ‘আলাইহিস সালাম’ বলা যাবে কি না—তা ইসলামি ফিকহ, উলুমুল হাদিস ও তাফসির শাস্ত্রে গভীরভাবে পর্যালোচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা।
নিম্নে সিরাত, হাদিসের ভাষ্য, চার মাযহাবের প্রামাণ্য ফাতাওয়া ও শীর্ষস্থানীয় তাফসির গ্রন্থসমূহের আলোকে মাসআলাটির একটি সমন্বিত ও সুবিন্যস্ত তাহক্বীক্বী রূপ তুলে ধরা হলো।
১. সর্বসম্মত ক্ষেত্র: নবীর অনুবর্তী (তাবে‘) হিসেবে দরুদ পাঠ
উম্মতের ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত (ইজমা) যে, নবীজি ﷺ-এর অনুবর্তী করে তাঁর পরিবারবর্গ (আহলে বাইত), সহধর্মিণী ও সাহাবায়ে কেরামের ওপর দরুদ পাঠ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
ইমাম নববী (রহ.)-এর বক্তব্য (‘কিতাবুল আজকার’):
> «أَجْمَعُوا عَلَى جَوَازِ الصَّلَاةِ عَلَى غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ تَبَعًا لَهُمْ، فَيُقَالُ: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، وَأَزْوَاجِهِ، وَذُرِّيَّتِهِ، كَمَا جَاءَتْ بِهِ الْأَحَادِيثُ الصَّحِيحَةُ.»
> “আলেমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, নবীগণের অনুবর্তী করে অন্যদের ওপর দরুদ পাঠ করা জায়েজ। যেমনটি সহিহ হাদিসসমূহে এসেছে, এভাবে বলা যায়: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ ওয়া আজওয়াজিহি ওয়া জুররিয়্যাতিহ’ (হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ﷺ এবং তাঁর পরিবার, স্ত্রী ও বংশধরদের ওপর দরুদ বর্ষণ করুন)।”
>
‘আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যাহ’ (ফাতাওয়া আলমগীরী):
> «وَلَا يُصَلَّى عَلَى غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمَلَائِكَةِ اسْتِقْلَالًا، وَلَا بَأْسَ بِأَنْ يُصَلَّى عَلَى النَّبِيِّ ﷺ وَيَدْخُلَ فِيهِ آلُهُ وَأَصْحَابُهُ وَأَوْلِيَاؤُهُ وَسَائِرُ الْمُؤْمِنِينَ تَبَعًا، كَذَا فِي فَتَاوَى قَاضِي خَانْ.»
> “নবী ও ফেরেশতাগণ ব্যতীত অন্য কারো ওপর এককভাবে দরুদ পাঠ করা যাবে না। তবে নবীজি ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করে তাঁর অনুবর্তী হিসেবে তাঁর পরিবার, সাহাবী, আওলিয়া-কেরাম এবং সমস্ত মুমিনদের শামিল করাতে কোনো বাধা নেই—যেমনটি ‘ফাতাওয়া কাজী খান’-এ উল্লেখিত রয়েছে।”
>
২. মতপার্থক্যপূর্ণ ক্ষেত্র: স্বতন্ত্রভাবে (এককভাবে) দরুদ পাঠ
নবীজি ﷺ-এর নাম উল্লেখ না করে এককভাবে কোনো সাহাবী বা মুমিনের নামের সাথে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলা যাবে কি না—এ বিষয়ে আলেমদের দুটি সুস্পষ্ট ধারা রয়েছে:
প্রথম মত: আভিধানিক অর্থে নিঃশর্ত বৈধতা
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর এক বর্ণনামতে, আভিধানিক অর্থ (দোয়া ও রহমত) বিবেচনায় যেকোনো মুমিনের জন্য দরুদ পাঠ করা জায়েজ।
ইমাম আল-ক্বাসতালানী (রহ.) ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ’ গ্রন্থে এই মতের দলিল তুলে ধরে লেখেন:
> «وَذَهَبَ جَمَاعَةٌ — مِنْهُمُ الْإِمَامُ أَحْمَدُ فِي الرِّوَايَةِ الْأُخْرَى وَابْنُ عَبَّاسٍ وَغَيْرُهُمَا — إِلَى الْجَوَازِ مُطْلَقًا اسْتِقْلَالًا؛ لِقَوْلِهِ تَعَالَى: {هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ}، وَقَوْلِهِ تَعَالَى: {خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ}، وَلِحَدِيثِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي أَوْفَى قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا أَتَاهُ قَوْمٌ بِصَدَقَتِهِمْ قَالَ: «اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَيْهِمْ»، فَأَتَاهُ أَبِي بِصَدَقَتِهِ، فَقَالَ: «اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى آلِ أَبِي أَوْفَى».»
> “একদল আলেম—যাঁদের মধ্যে ইমাম আহমদের একটি বর্ণনা এবং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) অন্যতম—স্বতন্ত্রভাবে দরুদ পাঠকে নিঃশর্তভাবে জায়েজ বলেছেন। দলীল হিসেবে তাঁরা পেশ করেন আল্লাহর বাণী: ‘তিনিই তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও...’ (সূরা আল-আহযাব: ৪৩) এবং ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন... এবং তাদের জন্য দোয়া (দরুদ) করুন’ (সূরা আত-তাওবাহ: ১০৩)। এছাড়াও আব্দুল্লাহ ইবনে আবি আওফা (রা.) বর্ণিত সহিহ হাদিস, যেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ সদকাকারীদের জন্য ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা আলি আবি আওফা’ বলে দোয়া করেছিলেন।”
>
দ্বিতীয় মত: জমহুর (অধিকাংশ) আলেমদের দৃষ্টিভঙ্গি (মাকরূহে তানজিহি বা অনুচিত)
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী এবং ইমাম আহমদের সুপ্রসিদ্ধ বর্ণনামতে—নবী-রাসুল ও ফেরেশতাগণ ব্যতীত অন্য কারো ক্ষেত্রে এককভাবে ‘সালাত’ বা দরুদ প্রয়োগ করা মাকরূহে তানজিহি কিংবা খিলাফে আওলা (উত্তম পন্থার পরিপন্থী)।
ইমাম নববী (রহ.) ‘আল-আযকার’ গ্রন্থে এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত ইলমি কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন:
> «وَقَالَ الْأَكْثَرُونَ مِنَ الْعُلَمَاءِ: لَا تَجُوزُ الصَّلَاةُ عَلَى غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ اسْتِقْلَالًا. وَقَالَ أَصْحَابُنَا: لَيْسَتْ بِحَرَامٍ، بَلْ هِيَ مَكْرُوهَةٌ كَرَاهَةَ تَنْزِيهٍ، أَوْ خِلَافُ الْأَوْلَى، وَالصَّحِيحُ الَّذِي عَلَيْهِ الْأَكْثَرُونَ أَنَّهَا مَكْرُوهَةٌ كَرَاهَةَ تَنْزِيهٍ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ شِعَارُ أَهْلِ الْبِدَعِ، وَقَدْ نُهِينَا عَنْ شِعَارِهِمْ... وَالْمُعْتَمَدُ فِي ذَلِكَ أَنَّ الصَّلَاةَ صَارَتْ مَخْصُوصَةً فِي لِسَانِ السَّلَفِ بِالْأَنْبِيَاءِ صَلَوَاتُ اللَّهِ وَسَلَامُهُ عَلَيْهِمْ، كَمَا أَنَّ قَوْلَنَا: «عَزَّ وَجَلَّ» مَخْصُوصٌ بِاللَّهِ تَعَالَى، فَكَمَا لَا يُقَالُ: «مُحَمَّدٌ عَزَّ وَجَلَّ» وَإِنْ كَانَ عَزِيزًا جَلِيلًا، لَا يُقَالُ: «أَبُو بَكْرٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ» وَإِنْ كَانَ مَعْنَاهُ صَحِيحًا.»
> “অধিকাংশ আলেমের মতে, নবীগণ ছাড়া অন্য কারো ওপর স্বতন্ত্রভাবে দরুদ পাঠ করা অনুচিত। আমাদের শাফেয়ী ইমামগণ বলেছেন: এটি সরাসরি হারাম নয়, বরং মাকরূহে তানজিহি (অপছন্দনীয়) কিংবা উত্তম পন্থার বিপরীত। বিশুদ্ধতম অভিমত হলো এটি মাকরূহে তানজিহি; কারণ নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর একক দরুদ পাঠ করা বিদআতিদের বিশেষ প্রতীকে (শি'আর) পরিণত হয়েছে, আর তাদের প্রতীকী আচরণ থেকে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে।
> এর নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হলো: সালাফদের (পূর্বসূরি নেককারদের) ব্যবহারে ‘সালাত’ শব্দটি কেবল নবীগণের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেছে। যেমনটি ‘আয্যা ওয়া জাল্লা’ (عَزَّ وَجَلَّ) পরিভাষাটি একমাত্র মহান আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট। তাই মুহাম্মদ ﷺ অতি মর্যাদাবান হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ‘মুহাম্মদ আয্যা ওয়া জাল্লা’ বলা যায় না; একইভাবে আবু বকর (রা.) মর্যাদাবান হলেও তাঁকে স্বতন্ত্রভাবে ‘আবু বকর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলা যাবে না—যদিও পারিভাষিক অর্থের দিক থেকে এটি এক প্রকার দোয়া হিসেবে শুদ্ধ।”
>
অনুরূপভাবে ইমাম আল-ক্বাসতালানী (রহ.) ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ’ গ্রন্থে লেখেন:
> «فَلَا يُقَالُ: اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى أَبِي بَكْرٍ، أَوْ عَلَى عُمَرَ، أَوْ عَلَى عَلِيٍّ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ صَارَ شِعَارًا لِلْأَنْبِيَاءِ إِذَا ذُكِرُوا، فَلَا يُلْحَقُ بِهِمْ غَيْرُهُمْ، وَلِأَنَّهُ قَدْ يُؤَدِّي إِلَى الْإِيهَامِ وَالْخَلْطِ بَيْنَ رُتْبَةِ النُّبُوَّةِ وَغَيْرِهَا.»
> “অতএব স্বতন্ত্রভাবে ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা আবি বাকর’ কিংবা ‘উমর’ বা ‘আলী’ বলা যাবে না; কারণ দরুদ নবীগণের এক অনন্য মর্যাদাপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ফলে অন্যদের তাঁদের সমকক্ষ করা যায় না; অন্যথায় নবুওয়াত ও সাধারণ মর্যাদার মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে।”
>
৩. চার মাযহাবের ফিকহ ও ফাতাওয়া গ্রন্থের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত
হানাফী মাযহাব: রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী)
গ্রন্থকার: আল্লামা ইবনে আবিদীন আশ-শামী (রহ.)
> «وَاخْتُلِفَ فِي الصَّلَاةِ عَلَى غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ اسْتِقْلَالًا: فَالْأَصَحُّ الْمَنْعُ؛ لِأَنَّهَا مَخْصُوصَةٌ بِهِمْ عُرْفًا كَمَا أَنَّ (عَزَّ وَجَلَّ) مَخْصُوصٌ بِاللَّهِ تَعَالَى... وَعَنْ أَبِي حَنِيفَةَ أَنَّهُ لَا يُصَلِّي عَلَى غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ، وَكَذَا لَا يُسَلِّمُ، وَفِي الْخُلَاصَةِ: وَيُكْرَهُ أَنْ يُصَلَّى عَلَى غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ اسْتِقْلَالًا؛ لِأَنَّهُ صَارَ شِعَارًا لِأَهْلِ الْأَهْوَاءِ، وَلَا بَأْسَ بِهِ تَبَعًا.»
> “নবীগণ ছাড়া অন্য কারো ওপর এককভাবে দরুদ পাঠের বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ অভিমত হলো এটি নিষিদ্ধ/বারণ; কেননা পারিভাষিক ও প্রচলিত ব্যবহারে দরুদ নবীগণের জন্যই নির্দিষ্ট, যেমনটি ‘আয্যা ওয়া জাল্লা’ একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত... ইমাম আবু হানিফা (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নবী ছাড়া অন্যের ওপর দরুদ পড়তেন না এবং সালামও দিতেন না। ‘আল-খুলাসাহ’ গ্রন্থে রয়েছে: নবীগণ ছাড়া অন্যের ওপর স্বতন্ত্রভাবে দরুদ পাঠ করা মাকরূহ; কেননা এটি বিদআতি ও প্রবৃত্তিপূজারীদের প্রতীকে (শি'আর) পরিণত হয়েছে। তবে নবীর অনুবর্তী করে পড়লে কোনো অসুবিধা নেই।”
>
হাম্বলী মাযহাব: আল-মুগনী
গ্রন্থকার: ইমাম মুওয়াফফাকুদ্দীন ইবনে কুদামা আল-মাক্বদিসী (রহ.)
> «فَصْلٌ: وَيُكْرَهُ إِفْرَادُ غَيْرِ الْأَنْبِيَاءِ بِالصَّلَاةِ وَالسَّلَامِ... لِأَنَّ الصَّلَاةَ صَارَتْ مَخْصُوصَةً فِي عُرْفِ الِاسْتِعْمَالِ بِالْأَنْبِيَاءِ، فَتَخْصِيصُ غَيْرِهِمْ بِهَا يُوهِمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ، وَلِأَنَّ ذَلِكَ صَارَ شِعَارًا لِأَهْلِ الْبِدَعِ، فَنُهِيَ عَنْهُ كَالصَّلَاةِ عِنْدَ طُلُوعِ الشَّمْسِ لَمَّا كَانَتْ شِعَارًا لِعَبَدَةِ الشَّمْسِ.»
> “পরিচ্ছেদ: নবীগণ ছাড়া অন্য কাউকে এককভাবে দরুদ ও সালামের জন্য নির্ধারিত করা মাকরূহ... কারণ প্রচলিত ব্যবহারে দরুদ নবীগণের সাথেই খাস হয়ে গেছে; ফলে অন্য কাউকে এতে বিশিষ্ট করলে সে নবী কি না—এমন বিভ্রান্তি জন্ম দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি বিদআতিদের বিশেষ প্রতীকে পরিণত হয়েছে, তাই তা বারণ করা হয়েছে—যেমন সূর্যোদয়ের সময় নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে সূর্যপূজকদের প্রতীকের সাথে সাদৃশ্য থাকার কারণে।”
>
৪. শীর্ষস্থানীয় তাফসির গ্রন্থসমূহের অভিমত
তাফসিরুত তাবারি (জামি‘উল বায়ান)
ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি (রহ.) [সূরা আল-আহযাব: ৫৬]:
> «وَقَدْ كَرِهَ جَمَاعَةٌ مِنَ الْعُلَمَاءِ أَنْ يُفْرَدَ أَحَدٌ سِوَى الْأَنْبِيَاءِ صَلَوَاتُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ بِالصَّلَاةِ، وَقَالُوا: لَا يُقَالُ: فُلَانٌ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ، وَإِنَّمَا يُقَالُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ وَلِسَائِرِ الْأَنْبِيَاءِ، وَيُدْعَى لِغَيْرِهِمْ بِالْمَغْفِرَةِ وَالرِّضْوَانِ، لِأَنَّ الصَّلَاةَ صَارَتْ مَخْصُوصَةً بِالْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ السَّلَامُ فِي الشَّرْعِ كَالنُّبُوَّةِ.»
> “আলেমগণের এক বৃহৎ দল নবীগণ (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) ছাড়া অন্য কাউকে এককভাবে দরুদের সাথে খাস করাকে মাকরূহ জেনেছেন। তাঁরা বলেছেন: অমুকের ওপর দরুদ বর্ষিত হোক—এভাবে বলা যাবে না; এটি কেবল নবীজি ﷺ এবং অন্যান্য নবীগণের ক্ষেত্রেই বলা হবে। তাঁদের বাইরে অন্যদের জন্য মাগফিরাত ও সন্তুষ্টির দোয়া (যেমন: রাহিমাহুল্লাহ, রাদিয়াল্লাহু আনহু) করা হবে। কারণ শরিয়তের পরিভাষায় নবুওয়াতের মতোই ‘সালাত’ বা দরুদ নবীগণের জন্যই নির্দিষ্ট বিষয়ে পরিণত হয়েছে।”
>
তাফসিরুল কুরতুবি (আল-জামি‘ লি-আহকামিল কুরআন)
ইমাম আবু আব্দুল্লাহ আল-কুরতুবি (রহ.) [সূরা আল-আহযাব: ৫৬]:
> «هَذِهِ الْمَسْأَلَةُ اخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ فِيهَا: هَلْ يُصَلَّى عَلَى غَيْرِ النَّبِيِّ ﷺ أَمْ لَا؟ فَقَالَ مَالِكٌ: لَا أَعْلَمُ الصَّلَاةَ عَلَى أَحَدٍ إِلَّا عَلَى النَّبِيِّ ﷺ، وَلَا يُعْجِبُنِي أَنْ يُصَلَّى عَلَى غَيْرِهِ. وَقَالَ أَصْحَابُنَا: ذَلِكَ خَاصٌّ بِالنَّبِيِّ ﷺ وَبِالْأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمُ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، وَلَا يُصَلَّى عَلَى غَيْرِهِمْ اسْتِقْلَالًا؛ لِأَنَّ ذَلِكَ صَارَ شِعَارًا لَهُمْ، وَلَمْ يَكُنْ مِنْ فِعْلِ السَّلَفِ أَنْ يُفْرِدُوا أَحَدًا مِنَ الصَّحَابَةِ بِالصَّلَاةِ.»
> “নবীজি ﷺ ব্যতীত অন্যের ওপর দরুদ পড়া যাবে কি না—এ বিষয়ে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। ইমাম মালেক (রহ.) বলেন: নবীজি ﷺ ব্যতীত অন্য কারো ওপর সালাত পাঠের বিধান আমার জানা নেই এবং অন্যের ওপর দরুদ পড়া আমি পছন্দ করি না। আমাদের মালেকী ফকিহগণ বলেছেন: এটি নবীজি ﷺ এবং সমস্ত নবীগণের জন্যই খাস; এককভাবে অন্যদের ওপর দরুদ পড়া যাবে না। কেননা এটি নবীগণের সুনির্দিষ্ট প্রতীকে রূপ নিয়েছে এবং সাহাবীদের কাউকে এককভাবে দরুদের সঙ্গে নির্দিষ্ট করা সালাফদের আমল ছিল না।”
তাফসির ইবনে কাসির
হাফেজ ইমাদুদ্দীন ইবনে কাসির (রহ.) [সূরা আল-আহযাব: ৫৬]:
> «وَقَدْ غَلَبَ هَذَا فِي عُرْفِ كَثِيرٍ مِنَ الْمُتَأَخِّرِينَ: أَنَّهُمْ يُطْلِقُونَ الصَّلَاةَ عَلَى عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ دُونَ غَيْرِهِ مِنَ الصَّحَابَةِ، فَيَقُولُونَ: «عَلِيٌّ عَلَيْهِ السَّلَامُ»، أَوْ «صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ»، وَهَذَا لَا يَنْبَغِي، بَلِ الْمَسْنُونُ أَنْ يُتَرَضَّى عَنِ الصَّحَابَةِ كُلِّهِمْ، وَلَا يُخَصَّ أَحَدٌ مِنْهُمْ بِشَيْءٍ يُوهِمُ تَفْضِيلَهُ بِمَا لَمْ يُفَضِّلْهُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ بِهِ، وَإِنَّمَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى الْأَنْبِيَاءِ وَالْمَلَائِكَةِ خَاصَّةً.»
> “পরবর্তী যুগের অনেকের অভ্যাসে এটি জেঁকে বসেছে যে, তারা অন্যান্য সাহাবীদের বাদ দিয়ে এককভাবে হযরত আলী (রা.)-এর নামের সাথে ‘আলাইহিস সালাম’ বা ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি’ বলে থাকে। এটি সমীচীন নয়; বরং সুন্নাহসম্মত নিয়ম হলো সকল সাহাবীর জন্যই ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ (আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হোন) বলা। তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে এমন কোনো শব্দে বিশিষ্ট করা উচিত নয় যা নবুওয়াতসদৃশ কোনো বিভ্রান্তি তৈরি করে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল করেননি। মূলত দরুদ ও সালাম নবী এবং ফেরেশতাগণের জন্যই নির্ধারিত।”
৫. সালাম (السلام) সংক্রান্ত বিধান
ইমাম নববী (রহ.) শায়খ আবু মুহাম্মদ আল-জুওয়াইনী (রহ.)-এর সূত্রে উল্লেখ করেন যে, সালামের হুকুমও সালাতের অনুরূপ:
> «وَأَمَّا السَّلَامُ، فَقَالَ الشَّيْخُ أَبُو مُحَمَّدٍ الْجُوَيْنِيُّ: هُوَ فِي مَعْنَى الصَّلَاةِ فَلَا يُسْتَعْمَلُ فِي الْغَائِبِ، فَلَا يُقَالُ: «عَلِيٌّ عَلَيْهِ السَّلَامُ»، بَلْ يُسْتَعْمَلُ فِي الْحَاضِرِ فَيُقَالُ: «السَّلَامُ عَلَيْكَ».»
> “সালামের ক্ষেত্রে শায়খ আবু মুহাম্মদ আল-জুওয়াইনী বলেন: এটি সালাতের মতোই একটি বিষয়। তাই কোনো অনুপস্থিত সাধারণ ব্যক্তির জন্য এককভাবে ‘আলী আলাইহিস সালাম’ বলা যাবে না; বরং এটি কেবল উপস্থিত ব্যক্তির সাক্ষাতের অভিবাদন হিসেবে ব্যবহৃত হবে (যেমন: আসসালামু আলাইকুম)।”
সমন্বিত তাহক্বীক্ব ও ফিকহি নির্যাস
উপরে উপস্থাপিত হাদিস, তাফসির ও চার মাযহাবের ফিকহী বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল তত্ত্বটি স্পষ্ট হয়:
* ভাষাগত অর্থ বনাম শরয়ী পরিভাষা: রাসুলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক সাহাবীদের জন্য ‘সালাত’ প্রয়োগের নজির হাদিসে পাওয়া যায় (যেমন: আলে আবি আওফার ঘটনা), যা ছিল তাঁর পক্ষ থেকে দোয়াস্বরূপ ভাষাগত প্রয়োগ। কিন্তু পরবর্তী যুগে সালাফ ও আইম্মায়ে কেরামের ইজমার মাধ্যমে ‘সালাত’ ও ‘সালাম’ নবী-রাসুল এবং ফেরেশতাগণের জন্য একটি একক ও অনন্য মর্যাদাপূর্ণ প্রতীকী (শি'আর) পরিভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।
* বিদআতের সাদৃশ্য পরিহার: এককভাবে কোনো সাহাবী (যেমন: কেবল আলী রা.-কে ‘আলাইহিস সালাম’ বলা) বা ওলির ওপর দরুদ পাঠ করা রাফেযী ও আহলে বিদআতদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। শরিয়তের প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো বিদআতিদের প্রতীকী সাদৃশ্য ত্যাগ করা ওয়াজিব।
* সালাফদের সুন্নাহসম্মত শিষ্টাচার: সাহাবায়ে কেরামের নামের ক্ষেত্রে «رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ» (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এবং পরবর্তী মুহাদ্দিস, ফকিহ ও আওলিয়া-উলামার ক্ষেত্রে «رَحِمَهُ اللَّهُ» (রহিমাহুল্লাহ) কিংবা «قُدِّسَ سِرُّهُ» ব্যবহার করাই সালাফে সালেহীনের অবিচ্ছিন্ন ঐতিহ্য।
* চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: নবীজি ﷺ-এর সঙ্গে অনুবর্তী (তাবে‘) করে পড়া ব্যতীত এককভাবে কোনো সাহাবী, ওলি বা সাধারণ মুমিনের নামের সাথে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ কিংবা ‘আলাইহিস সালাম’ বলা মাকরূহে তানজিহি বা অপছন্দনীয়। সুন্নাহ ও সালাফদের অনুসৃত পদ্ধতি আঁকড়ে ধরাই সর্বাধিক নিরাপদ ও বিশুদ্ধতম পন্থা।
মুফতী ওসমান গনী সালেহী।
হুজুরের ফেইজবুক পোস্ট।
.jpeg)
0 Comments