---গতকাল জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া আইন: একটি সরল বিশ্লেষণ----
হেবা (দান), সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ২০২৬ এবং শরিয়তের অকাট্য বিধানের সুবিন্যস্ত রূপরেখা
১. হেবা বা দানের শরয়ী সংজ্ঞা ও শর্ত
বিনা মূল্যে স্বেচ্ছায় অপর কাউকে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করাকে হেবা বলা হয়। ইসলামী শরিয়তে হেবা সম্পন্ন ও কার্যকর হওয়ার জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত পূরণ হতে হয়:
* দাতার সুস্পষ্ট প্রস্তাব (الإيجاب)
* গ্রহীতার সম্মতি বা গ্রহণ (القبول)
* বাস্তব দখল হস্তান্তর (القبض والتسليم)
২. কোরআন মাজিদের আলোকে আমল ও চুক্তি বিনষ্ট না করার নীতি
হেবা সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর তা অহেতুক বাতিল বা বিনষ্ট করা কোরআনের সাধারণ নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী:
> يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ
> “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসুলের আনুগত্য করো, আর তোমরা তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করো না।”
> — সূরা মুহাম্মদ (৪৭): ৩৩
৩. রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের হেবা প্রত্যাহার না হওয়ার অকাট্য হাদিস
দখল হস্তান্তরের পর রক্তের মাহরাম আত্মীয় কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার হেবা কোনো অবস্থাতেই ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
> عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِذَا كَانَتِ الْهِبَةُ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ فَلَا رُجُوعَ فِيهَا»
> ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন: “যদি দান কোনো রক্তসম্পর্কীয় মাহরাম আত্মীয়ের অনুকূলে হয়, তবে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।”
> — সুনানে দারা কুতনি (হাদিস: ২৯৭৯)
৪. ইসলামী ফিকহের প্রামাণ্য দলিল (ফিকহে হানাফি)
* বাদায়েউস সানায়ে (ইমাম কাসানী রহ.):
> «فَأَمَّا إِذَا كَانَتِ الْهِبَةُ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ مِنْ نَسَبِهِ فَلَا رُجُوعَ فِيهَا إِجْمَاعًا... وَلِأَنَّ مَقْصُودَهُ مِنْ هَذِهِ الْهِبَةِ حُصُولُ الثَّوَابِ بِصِلَةِ الرَّحِمِ، وَالثَّوَابُ قَدْ حَصَلَ، فَلَا يَجُوزُ لَهُ الرُّجُوعُ كَمَا فِي الصَّدَقَةِ»
> “যদি দানটি বংশীয় মাহরাম আত্মীয়ের অনুকূলে হয়, তবে সর্বসম্মতিক্রমে (ইজমা দ্বারা) তা আর প্রত্যাহার করা যায় না। কারণ এ ধরনের দানের উদ্দেশ্য থাকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করা; আর দখল হস্তান্তরের সাথে সাথে সেই সওয়াব অর্জিত হয়ে গেছে। ফলে সদকার মতো এটিও আর প্রত্যাহার করা কোনোভাবেই বৈধ নয়।”
> — বাদায়েউস সানায়ে ফি তারতিবিশ শারায়ে, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৮৩
* আল-হিদায়া (ইমাম মারগিনানি রহ.):
> «وَإِذَا وَهَبَ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ مِنْهُ نَسَبًا فَلَا رُجُوعَ فِيهَا، لِقَوْلِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ: إِذَا كَانَتِ الْهِبَةُ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ فَلَا رُجُوعَ فِيهَا، وَلِأَنَّ الْمَقْصُودَ صِلَةُ الرَّحِمِ، وَقَدْ حَصَلَ»
> “যদি কেউ বংশীয় রক্তের মাহরাম আত্মীয়কে হেবা করে, তবে সে ক্ষেত্রে দান ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। কারণ নবী ﷺ বলেছেন: ‘মাহরাম আত্মীয়ের জন্য দান করা হলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।’ তাছাড়া এর উদ্দেশ্য আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা, যা হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে গেছে।”
> — আল-হিদায়া, কিতাবুল হিবাহ, বাবুর রুজু ফিল হিবাহ
* রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার (আল্লামা ইবনে আবেদীন রহ.):
> «فَلَوْ كَانَ الْمَوْهُوبُ لَهُ ذَا رَحِمٍ مَحْرَمٍ نَسَبًا بَطَلَ الرُّجُوعُ مُطْلَقًا»
> “দানগ্রহীতা যদি বংশীয় রক্তের মাহরাম আত্মীয় হয়, তবে হেবা বাতিল বা প্রত্যাহারের দাবি সম্পূর্ণরূপে বাতিল ও অকার্যকর।”
> — রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭১০
৫. ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬
পাস হওয়া বিলে বিধান রাখা হয়েছে যে, পিতা-মাতা সন্তান বা রক্তসম্পর্কীয় কাউকে জমি লিখে দেওয়ার সময় দলিলে জীবদ্দশায় নিজে বসবাস ও ভোগদখল করার শর্ত যুক্ত করতে পারবেন এবং তাদের সম্মতি ছাড়া গ্রহীতা তা বিক্রি করতে পারবে না।
৬. রাষ্ট্রীয় বিধান বনাম শরীয়ত: মূল ফয়সালা
পিতা-মাতার মানবিক দিক বা অসহায়ত্ব যতই বিবেচনা করা হোক না কেন, কোনো আইন বা বিধান যদি সরাসরি ইসলামী শরিয়তের অকাট্য মূলনীতির বিরোধী হয়, তবে একজন মুসলিমের জন্য শরিয়ত পরিপন্থী সেই বিধান মানা বা প্রয়োগ করা বৈধ নয়।
শরিয়তের দৃষ্টিতে হেবা হলো সম্পূর্ণ নিঃশর্ত মালিকানা হস্তান্তর; দখল বুঝিয়ে দেওয়ার পর গ্রহীতাই সেই সম্পত্তির নিরঙ্কুশ ও চূড়ান্ত মালিক। পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও সম্মান নিশ্চিত করা সন্তানের ওপর শরিয়তের স্বতন্ত্র ফরজ বিধান, কিন্তু সেটির অজুহাতে হেবার শরয়ী নিয়ম বা মালিকানার সীমা পরিবর্তন করা শরিয়তসম্মত নয়।
লেখক : মুফতী ওসমান গনী সালেহী
দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা।
০৯/০৯/২০২৬ ইং মঙ্গলবার বাংলাদেশ।
নিউজ সূত্র : মুফতী ওসমান গনী সালেহী হুজুরের ফেইজবুক পোস্ট।


0 Comments